ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গাজীপুরে প্রতিদিন ভাঙছে ৩০টি সংসার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | ১১ অক্টোবর, ২০২৫
গাজীপুরে প্রতিদিন ভাঙছে ৩০টি সংসার ফাইল ছবি

বেশ ঘটা করেই বিয়ে হয় পারুলের (ছদ্মনাম)। মা-বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন তিনি। কিছুদিন পার না হতেই স্বামী মবিন (ছদ্মনাম) তাকে নির্যাতন শুরু করেন। প্রতিদিন গভীর রাতে বাড়ি ফিরে কোনো কারণ ছাড়াই স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালান। পরে পারুল জানতে পারেন তার স্বামী ইয়াবায় আসক্ত। বন্ধুদের সঙ্গে ইয়াবা সেবন করে রাতে বাসায় ফিরে স্ত্রীকে পেটান। শেষ পর্যন্ত পারুল আর সহ্য করতে না পেরে কাজী অফিসে গিয়ে স্বামীকে তালাক দিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান। 


শফিক আলমের গল্পটা একটু অন্যরকম। প্রেম করে রাজিয়া নাহারকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন তিনি। সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু শফিকের বৃদ্ধ বাবা-মাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না রাজিয়া। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে সব সময় খারাপ আচরণ করতেন। শফিক এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত শফিক তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন। 


পরকীয়ায় আসক্ত হাফসা খাতুন প্রতিদিন রাতে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্বামী রাসেল আহমেদকে ফাঁকি দিয়ে মাসের পর মাস এমনটি চলছিল। একদিন রাসেলের হাতে ধরা পড়েন হাফসা। এরপরই তাঁকে তালাক দিয়ে নতুন সংসার করেন রাসেল। 


রাতুল খন্দকারের ঘটনাটা উল্টো। বিয়ে করা স্ত্রীকে ঘরে রেখে পাশের বাড়ির ভাবির সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। স্ত্রী কোহিনূরের হাতে ধরাও পড়েন। এক পর্যায়ে স্বামীকে তালাক দিয়ে চলে যান কোহিনূর। সবগুলো ঘটনাই গাজীপুরের। নামগুলো ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।


এভাবেই নানা কারণে প্রতিদিন গাজীপুরে গড়ে ৩৩টি সংসার ভেঙে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি দুই ঘণ্টায় তিনটি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। আশঙ্কাজনক হারে বিয়ে বিচ্ছেদের এসব ঘটনাকে স্বাভাবিক বলতে নারাজ সমাজ বিশ্লেষকরা। 


গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৯ মাসে গাজীপুরে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে ১৪ হাজার ৮০টি। একই সময়ে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে সাত হাজার ৮৪৩টি। অর্থাৎ একই সময়ে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। 


সূত্রমতে, নারীরাই বেশি বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন। ভরণপোষণে স্বামীর অক্ষমতা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মনের মিল না হওয়া ইত্যাদি বিষয়কে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তারা। কয়েকজন কাজী জানান, নারীরাই বেশি বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন। অনেকে সুস্পষ্ট কারণ প্রকাশ না করে বনিবনা না হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। অনেকেই পরকীয়া, নির্যাতনকে কারণ হিসেবে দেখান। গাজীপুরের তিনটি কাজী অফিসে গত ৯ মাসে ৩২৮টি বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে নারীর আবেদন ছিল ২৫০টি।



গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ড জিরানী ও পানিশাইল এলাকার নিয়োগকৃত কাজী মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। গত ৯ মাসে তিনি বিয়ে পড়ানোর কাজ সম্পন্ন করেছেন ১২৬টি। আর তালাক সম্পন্ন করেছেন ১৩৩টি। তিনি বলেন, তালাক বেশি দিচ্ছেন নারীরা। ১৩৩টির মধ্যে ১০০টি তালাক দিয়েছেন তারা। কারণ হিসেবে তাদের বেশির ভাগই স্বামীর পরকীয়া ও মাদকাসক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। 


শ্রীপুর পৌরসভার ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী একেএম হিফজুর রহমান বলেন, গত ৯ মাসে তাঁর মাধ্যমে ৩৬৭টি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। তালাক হয়েছে ১৩৭টি। এর মধ্যে ১০৫টি তালাকই নারীরা দিয়েছেন। কারণ হিসেবে স্বামীর অক্ষমতা, পরকীয়া ও মাদকাসক্ত হয়ে নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 


গাজীপুর সদরের পিরুজালী এলাকার কাজী মুহাম্মদ মুহিতুজ্জামান বলেন, ৯ মাসে তিনি বিয়ে সম্পন্ন করেছেন ৬০টি। তালাক করিয়েছেন ৫৮টি। এর মধ্যে ৪৫টি ক্ষেত্রেই নারীরা তালাক দিয়েছেন স্বামীকে। কারণ হিসেবে দাম্পত্য জীবনে বনিবনা না হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তারা।


বিবাহ বিচ্ছেদের নানা কারণ বিশ্লেষণ করেছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা, মাদকের আসক্তি, পারিবারিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি। 


সমাজবিশ্লেষক ও গাজীপুরের পিয়ার আলী কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক শেখ কামরুন্নাহার সমকালকে বলেন, বিয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি তালাকের সংখ্যাও। আশঙ্কাজনক হারে বিয়ে বিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, সম্পর্কের যত্ন ও ভালোবাসার অভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও দাম্পত্য জীবনে সমস্যা হতে পারে। আয়-ব্যয়ে পার্থক্য, সঞ্চয় ও খরচের অভ্যাসে মিল না থাকায় দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত তা তালাকেও গড়ায়। তিনি বলেন, বিশ্বায়নের প্রভাব, রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন, পরিবার ও সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চার অভাব, ব্যাপক ব্যক্তির স্বাধীনতা চর্চা, সামাজিক মাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও শূন্যতা এবং নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্যের চর্চা না থাকাও বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে।


গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছানোয়ারা সুলতানা বলেন, ছেলেমেয়েকে বিয়ে করানোর আগে উভয়ের পরিচয়, পরিবার বা ব্যক্তির পেছনের খোঁজখবর অবশ্যই নিতে হবে। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগে এসব খোঁজখবর নিলে তালাকের পরিমাণ কমে আসবে।


গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. যাবের সাদেক সমকালকে বলেন, গাজীপুর একটা শিল্পাঞ্চল। সারা দেশের মানুষই এ এলাকায় বসবাস করেন। চাকরি করেন। অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজন কারখানার শ্রমিক। স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ একজন অন্য রিলেশনে জড়িয়ে যায়। এ থেকে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। শেষে বিষয়টি তালাকে গিয়ে ঠেকে। তিনি বলেন, আবার এমনও হয়, স্ত্রী চাকরি করেন। স্বামী ভবঘুরে, মাদকাসক্ত। মাদক সেবনের জন্য স্ত্রীর কাছে টাকা চায়। কোনো এক পর্যায়ে টাকা না দিলে মারমারি হয়। এ ক্ষেত্রেও তালাকের ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, হত্যার ঘটনাও ঘটে। আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। তালাকপ্রাপ্ত এক নারীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, স্বামীকে তালাক না দিলে তাঁকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হতো। তাঁর স্বামী এক মেয়ের সঙ্গে পরকীয়া করত; যেটা আমি স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারিনি। ফেসবুকে পরিচয় সম্পর্ক থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা। তারপর স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তালাকে গিয়ে শেষ হয়। 


পরিবারকে না জানিয়ে ১৫ বছরের এক মেয়ে ১৮ বছরের এক ছেলেকে বিয়ে করে। ওই ছেলের সঙ্গে কথা হয়। সে জানায়, ফেসবুকে আমাদের পরিচয়। পরিবারকে না জানিয়ে দুজন বিয়ে করি। এখনও সংসার পাতা হয়নি। এরই মধ্যে ৯ মাস পরই ওই মেয়ে তাকে তালাক দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে ছেলেটি বলে, ফেসবুকে সে আমার চেয়ে বেটার আরেকজনকে পেয়েছে। এ কারণে তালাক দিয়েছে।


thebgbd.com/NIT