ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, অপরিশোধিত তেলের দামের চেয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘অশুভ সাম্রাজ্য’ থামানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান থেকে এএফপি জানায়, নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি গত রোববার সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর থেকে এখনো জনসমক্ষে উপস্থিত হননি। একটি বিমান হামলায় তিনি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া বার্তাটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক সংবাদ পাঠক পড়ে শোনান।
মোজতবা খামেনির বাবা আলি খামেনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রথম দফা হামলায় নিহত হন। মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার আহ্বান জানান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার হাতিয়ার অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।’ বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সাধারণত এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। হামলার প্রতিশোধের ‘সীমিত অংশ’ ইতোমধ্যে বাস্তব রূপ পেয়েছে। তবে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে।
বৃহস্পতিবার ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে নতুন দফা হামলা চালায়। এতে তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায় এবং সতর্ক করা হয়, এই সংকট ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন’ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ট্রাম্প ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অশুভ সাম্রাজ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা।’
জাহাজে হামলা
বৃহস্পতিবার বাহরাইনে মুহাররাক এলাকায় জ্বালানি ট্যাংকে হামলার পর ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। বাসিন্দাদের ঘরে অবস্থান করতে এবং জানালা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ড্রোন হামলায় কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দুবাই শহরের কেন্দ্রেও আবার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের শাইবাহ তেলক্ষেত্র এবং দূতাবাস এলাকায় লক্ষ্য করে আসা ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক উপকূলের কাছে উপসাগরে আরও তিনটি জাহাজে হামলা হয়েছে। প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছে, ১৩ দিনের এই সংঘাত ‘বিশ্ব তেলবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন’ সৃষ্টি করছে, যা ১৯৭০-এর দশকের সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া এবং তেলবাহী ট্যাংকারগুলো উপসাগরে আটকে পড়ার কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেলের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
‘ভুল’ হবে
ইরানের এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা বুধবার সতর্ক করে বলেন, দেশটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালাতে পারে যা বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারে। দেশের ভেতরে চাপ বাড়তে থাকলেও ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে বিমান হামলা বন্ধ করার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু প্রায় ফুরিয়ে আসছে।
মেডিটেরানিয়ান ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক পিয়েরে রাজু এএফপিকে বলেন, ‘হোয়াইট হাউস যদি মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিলেই সংঘাত থেমে যাবে, তাহলে তারা ভুল করছে এবং ইতিহাসের শিক্ষা উপেক্ষা করছে। ইরানি শাসনব্যবস্থা, যাদের হারানোর আর কিছু নেই, আগ্রাসনের শাস্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ চালাবে।’
তেহরানের এক বাসিন্দা, যিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন দেখতে চান, এএফপিকে বলেন, প্রতিদিনের বোমাবর্ষণের ভয় থাকা সত্ত্বেও তিনি উদ্বিগ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের বিমান হামলা বন্ধ করে দিতে পারে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এবারও যদি বিষয়টি সফল না হয়, তাহলে মানসিক ও আবেগিকভাবে আমাদের কী হবে আমি জানি না।’
সংঘাতের বিস্তার
সংঘাত ইতোমধ্যে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। বৈরুতের রক্তাক্ত সমুদ্রতীরে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর তাঁবু এলাকায় হামলায় অন্তত আরও আটজন নিহত হয়েছেন। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ বুধবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান ঘোষণা করার পর ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সেনাদের লেবাননে হামলা ‘বিস্তৃত করার প্রস্তুতি’ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে লেবাননে সহিংসতায় ৬৮৭ জনের বেশি নিহত হয়েছেন এবং আট লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরানে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার নতুন তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধে ৩০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার তারা ইরানে নতুন ‘বৃহৎ আকারের’ হামলা শুরু করেছে। তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বে একটি হামলায় পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বুধবারের স্যাটেলাইট ছবিতে পারচিন সামরিক স্থাপনায় বাঙ্কার বিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে তিনটি হামলার চিহ্ন দেখা গেছে।
মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি অচল করে দিতে পারে—এই আশঙ্কার মধ্যে তারা ২৮টি ইরানি মাইন পেতে রাখা নৌযান ধ্বংস করেছে। ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ৫৪ কিলোমিটার। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে উপসাগর থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না। যদিও শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানি কিছুটা অব্যাহত রয়েছে।
আবারও তেলের দাম বৃদ্ধি
প্রধান ভোক্তা দেশগুলো কৌশলগত তেল মজুদ থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল ছাড়ার অনুমোদন দিলেও ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম আবারও ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে নেওয়া হয়েছে। তবুও বৈশ্বিক সংকটের আশঙ্কা পুরোপুরি কমেনি। এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের স্টিফেন ইনেস মন্তব্য করেন, ‘ট্রেডিং ডেস্কের ভাষায় আইইএর মজুদ ছাড়ার সিদ্ধান্তটি যেন একটি পরিশোধনাগারের আগুনে বাগানের পাইপ দিয়ে পানি ছিটানোর মতো।’
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৮ মার্চ জানিয়েছে, যুদ্ধে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে এএফপি এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ইসরায়েলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক ও সাতজন মার্কিন সেনা সদস্য রয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে।
পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে আইনপ্রণেতাদের জানানো হয়েছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ইতোমধ্যে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।
সূত্র: এএফপি
এসজেড