ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গৃহনির্যাতনের অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের’ দরকার নেই: ভারতীয় হাইকোর্ট

  • অনলাইন ডেস্ক | ২০ মে, ২০২৬
গৃহনির্যাতনের অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের’ দরকার নেই: ভারতীয় হাইকোর্ট ফাইল ছবি

পারিবারিক বিরোধে নিষ্ঠুরতার বিষয়টি ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ’ করার প্রয়োজন নেই, এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে বিকানেরের এক নারীর বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন রাজস্থান হাইকোর্ট। এর মাধ্যমে নিম্ন আদালতের (পারিবারিক আদালত) একটি আদেশ বাতিল করে দিলেন হাইকোর্ট।

গত সোমবার বিচারপতি অরুণ মোঙ্গা ও বিচারপতি সুনীল বেনিওয়ালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেন, দাম্পত্য নির্যাতনের বিষয়গুলো কঠোর ফৌজদারি আইনের মানদণ্ডে নয়, বরং ‘সম্ভাব্যতা ও পারিপার্শ্বিকতার গুরুত্বের’ (প্রিপন্ডারেন্স অব প্রবাবিলিটিজ) নীতিতে মীমাংসা করা উচিত।


রায়ে হাইকোর্টের যোধপুর বেঞ্চ রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী ‘আটা-সাটা’ বিয়ের রীতির তীব্র নিন্দা জানান। আদালত এটিকে ‘আইনি ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া’ আখ্যা দিয়ে ‘মানুষের জীবন নিয়ে এক অমানবিক বিনিময় প্রথা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। রাজস্থানে ‘আটা-সাটা’ বা ‘দেওয়া-নেওয়া’ বিয়ে হলো একটি পুরোনো প্রথা, যেখানে দুটি পরিবার নিজেদের মধ্যে মেয়ে (এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্কও) বিনিময় করে বিয়ে দেয়।


মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিকানেরে ওই আবেদনকারী নারীর বিয়ে হয়। একই দিনে আটা-সাটা প্রথা মেনে তাঁর স্বামীর এক অপ্রাপ্তবয়স্ক বোনের সঙ্গে ওই নারীর ভাইয়ের বিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই মেয়েটি বাল্যবিবাহ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর জের ধরে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়।

আবেদনকারী নারীর অভিযোগ, এ ঘটনার পর যৌতুকের দাবিতে তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে ২০২০ সালের ১৯ মার্চ তাঁর নাবালিকা কন্যাসন্তানসহ তাঁকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে তিনি যৌতুকের জন্য নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর স্বামী ও শ্বশুরের বিরুদ্ধে এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ এ বিষয়ে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়।

পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে স্বামীও নয়াশহর থানায় স্ত্রীর বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের বিরুদ্ধে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের ধারায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এই চলমান বিরোধের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে বিকানেরের পারিবারিক আদালতের দ্বারস্থ হন ওই নারী।

তবে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পারিবারিক আদালত তাঁর আবেদনটি খারিজ করে দেন। আদালত স্বামীর এই দাবিটি গ্রহণ করেন যে, স্ত্রী স্বেচ্ছায় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এ ছাড়া স্বামীর বোন অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় হওয়া বিয়েটি মেনে নিতে অস্বীকার করায় ওই পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এসব ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে।

পারিবারিক আদালতের এই আদেশে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই নারী হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলকারীর আইনজীবী যুক্তি দেখান, যৌতুকের দাবির কারণে ওই নারী প্রতিনিয়ত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে, স্বামীর দাবি ছিল, বৈবাহিক কলহের মূল কারণ তাঁর বোনের বিয়ে মেনে না নেওয়ার বিষয়টি।

পারিবারিক আদালতের রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে হাইকোর্ট বলেন, নিম্ন আদালত আটা-সাটা প্রথার কারণে সৃষ্ট পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে দাম্পত্য নির্যাতনের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলে ‘গুরুতর ভুল’ করেছেন।

শুনানি চলাকালে হাইকোর্ট ওই নারীর আইনজীবীর একটি বক্তব্য রেকর্ড করেন। যেখানে বলা হয়, মানসিক শান্তি ও বৈবাহিক সম্পর্কের অবসানের স্বার্থে ওই নারী অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের সব ধরনের ভরণপোষণের দাবি ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছেন। এই বক্তব্য আমলে নিয়ে আদালত ওই নারীর বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করেন।

হাইকোর্ট স্পষ্ট করে জানান, বিবাহবিচ্ছেদের এই আদেশের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান ফৌজদারি মামলা বা সন্তানের জিম্মাসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো প্রভাব পড়বে না। আইন অনুযায়ী সেসবের স্বাধীন বিচার চলবে।

বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০০৬-এর উল্লেখ করে আদালত আটা-সাটা প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন, যখন দুটি পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময়ের ভিত্তিতে বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে দেওয়া হয়, তখন এই প্রথা একটি জোরপূর্বক সামাজিক শৃঙ্খলে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের, ‘বিয়ের পণ্যে’ রূপান্তর করা হয়।

আদালত আরও বলেন, এই ধরনের ব্যবস্থা ‘বৈবাহিক জিম্মিদশার’ মতো, যেখানে এক মেয়ের জীবন ও স্বাধীনতা অন্য মেয়ের বাধ্যগত থাকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

আদালত পর্যবেক্ষণ দেন, ‘কোনো প্রথাই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’ এর সঙ্গে আদালত আরও যোগ করেন, শৈশবে বছরের পর বছর সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিংয়ের (প্রভাব বিস্তার) মাধ্যমে যে সম্মতি নেওয়া হয়, একজন ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাকে ‘মুক্ত বা স্বাধীন সম্মতি’ হিসেবে গণ্য করা যায় না।

thebgbd.com/NIT