ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পশ্চিমবঙ্গে গরুর হাটে ক্রেতাশূন্য!

  • অনলাইন ডেস্ক | ২৫ মে, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে গরুর হাটে ক্রেতাশূন্য! ফাইল ছবি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরুর বাজারে নেমে এসেছে আতঙ্ক, ভয় ও অনিশ্চয়তার ছায়া। ঈদের মাত্র কয়েক দিন আগে কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত বিশাল ধুলাগড় পশুর হাট প্রায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে।

বাজারজুড়ে বিক্রেতাদের উৎকণ্ঠা, আর গরমের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা শত শত গবাদিপশু যেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কলকাতা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরের পূর্ব মেদিনীপুর জেলা থেকে আসা এক হিন্দু বিক্রেতা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে গরু কেনার জন্য তিনি উচ্চ সুদে একাধিক ঋণ নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি মুসলমান বাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। ফলে কোরবানির ঈদকে ঘিরে সাধারণত গরুর বাজারে ব্যাপক বেচাকেনা হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিক্রেতা বলেন, “এখন গরু কিনবে কে? মানুষ ভয়ের মধ্যে আছে।”

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বদলে গেছে পরিস্থিতি

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের ধুলাগড় পশুর হাট ছিল হিন্দু বিক্রেতা ও মুসলিম ক্রেতাদের অন্যতম বড় মিলনস্থল। কোরবানির ঈদে ছাগল বা ভেড়ার পাশাপাশি বহু মুসলিম পরিবার যৌথভাবে গরু, মহিষ বা উট কিনে কোরবানি দিত এবং মাংস সাত ভাগে ভাগ করে নিত।

যদিও ১৯৫০ সালের একটি আইনে প্রকাশ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়, তবু বহু বছর ধরে বামপন্থী বা মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তির শাসনে পশ্চিমবঙ্গে এই আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়নি। ফলে কলকাতাসহ পুরো রাজ্য গরুর মাংস ও বিভিন্ন মাংসজাত খাবারের জন্য সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

তবে গত ৬ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারি ১৯৫০ সালের আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেন। এই আইনে বলা হয়েছে, সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনও গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। কেবল সরকার নির্ধারিত কসাইখানায় এবং ১৪ বছরের বেশি বয়সী পশু জবাইয়ের অনুমতি রয়েছে।

ভারতের বহু হিন্দু, বিশেষ করে উচ্চবর্ণের মানুষের কাছে গরু পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। এ কারণে দেশটির অধিকাংশ রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরু রক্ষার নামে স্বঘোষিত উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর হাতে বহু মুসলিম ও হিন্দু গবাদিপশু ব্যবসায়ী হামলা ও হত্যার শিকার হয়েছেন বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে।

বার্গারের কোনও ধর্ম নেই
বিজেপির নির্বাচনী জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে গরুর মাংসের ব্যবসায় ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আতঙ্কে অনেক রেস্তোরাঁ, কসাইখানা ও রাস্তার খাবারের দোকান ব্যবসা সীমিত বা বন্ধ করে দিয়েছে।

কলকাতার জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘দ্য বার্গার শপ’ তাদের পরিচিত বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি ইনস্টাগ্রামে লিখেছে, “আমাদের বার্গারের কোনও ধর্ম নেই। কিন্তু রাজনীতির আছে।”

রেস্তোরাঁটির সহ-মালিক উৎশা আল-জাজিরাকে বলেন, “১৪ মে আমরা জানতে পারি আমাদের গরুর মাংস সরবরাহকারী ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। পুলিশ তাকে ডেকে সাময়িকভাবে দোকান বন্ধ রাখতে বলেছিল। এরপর দ্রুত নতুন সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি, তাই বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে।”

তিনি বলেন, “আমাদের নিয়মিত ক্রেতারা হতাশ হয়েছেন। গরুর মাংসভিত্তিক খাবার আমাদের ব্যবসার বড় অংশ ছিল।”

এদিকে মুসলিম কসাই ও মাংস ব্যবসায়ীদের অনেকেই দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। জীবিত গরুর দাম কেজিপ্রতি ৪০০ রুপি থেকে নেমে কোথাও কোথাও ১৫০ রুপিতে দাঁড়িয়েছে।

কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার দু’টি মাংসের দোকানের মালিক ৬৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ হাশিম বলেন, “আমরা ৬০ বছর ধরে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছি। এত বছর কলকাতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখেছি। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “সরবরাহকারীরা ভীত-সন্ত্রস্ত। ছোট খাবারের দোকানগুলোও এখন গরুর মাংস কিনছে না। আগে রাত পর্যন্ত ব্যবসা চলত, এখন দুপুরের পরই দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরতে হয়।”

একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী হায়দার আলি বলেন, “ভয়ের কারণে রেস্তোরাঁগুলো এখন আর আমাদের কাছ থেকে কাঁচামাল নিচ্ছে না।”

কোরবানির আগে বড় ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা
ধুলাগড় পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন হিন্দু বিক্রেতা নিজেদের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের একজন বলেন, “কিছু গরু বিক্রি করতে পারলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। প্রতিটি অবিক্রীত পশুর জন্য প্রায় পাঁচ হাজার রুপি লোকসান গুনতে হচ্ছে।”

এই ব্যবসায়ীরা বছরের বাকি সময় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

হাটে উপস্থিত সুন্দর নামে এক মুসলিম ব্যবসায়ী জানান, তিনি ঈদের বাজারে ব্যবসার জন্য মায়ের গয়না বন্ধক রেখে ১০ লাখ রুপি ঋণ নিয়ে গরু কিনেছেন।

তিনি বলেন, “ঈদের মৌসুমে আমাদের পরিবার সাধারণত ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি আয় করে। কিন্তু এবার ২৫টি গরুর একটিও বিক্রি করতে পারিনি। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। আমি খুব আতঙ্কে আছি।”

গত বছর তিনি প্রায় ১০০টি গরু বিক্রি করেছিলেন বলে জানান।

বিজেপির অবস্থান ও বিশ্লেষকদের মত

বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, “যেসব আইন আগে মানা হতো না, এখন সেগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”

ভারতের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সাবেক সদস্য ও আইনজীবী জয়সিমা নুগ্গেহাল্লি বলেন, ভারতে গবাদিপশু জবাইবিরোধী আইনগুলোকে প্রাণী সুরক্ষার আইন হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এগুলো রাজনীতি, ব্যবসা ও গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে, গরু ও মাংস নিয়ন্ত্রণ এখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।”

মুসলিমদের রাস্তার নামাজেও বাধা
শুধু গরুর মাংস ব্যবসা নয়, ঈদের আগে মুসলিমদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কেরা রাস্তার ওপর জামাতে নামাজ পড়তে নিষেধ করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় শুক্রবার ও ঈদের নামাজে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক সময় রাস্তায় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

কলকাতার মুসলিমপ্রধান মল্লিকবাজার ও পার্ক সার্কাস এলাকায় ঈদের আগের ব্যস্ততা এবার অনেকটাই অনুপস্থিত বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

মল্লিকবাজারের এক লুঙ্গি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাজার একেবারে ফাঁকা। আগে কখনও এমন দেখিনি।”

বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও লেখক হর্ষ মান্দার বলেন, বিজেপি একটি ‘আদর্শিক প্রকল্প’ বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতায় এসেছে।

তার ভাষায়, “আরএসএস গত ১০০ বছর ধরে মুসলমানদের সমান নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। এখন বিজেপি সেই রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন করছে।”

তিনি আরও বলেন, “এটি এখন নিজের দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রকাশ্য যুদ্ধ।”

thebgbd.com/NIT