রাসুলুল্লাহ (সা.) তখনও মদিনায় পৌঁছাননি। মদিনার পথে তখনও হিজরতের কাফেলা যাত্রা শুরু করেনি। কিন্তু ইয়াসরিবের মাটিতে ইসলামের আলো ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। একদল নতুন মুসলিম কোরআনের বাণী শিখছে, একে অন্যকে ঈমানের দিকে আহ্বান করছে। আর সেই নবীন মুসলিম সমাজকে নেতৃত্ব দিতে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ সাহাবি—মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। ইতিহাসের এক অসাধারণ মুহূর্তে তাঁর নেতৃত্বেই মদিনার মুসলমানদের মধ্যে জুমার নামাজের আয়োজনের কথা বর্ণিত হয়েছে।
ভাবুন, যে শহরটি অচিরেই হবে ইসলামের রাজধানী, যে নগরীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিষ্ঠা করবেন ইসলামী সমাজের ভিত্তি—সেই মদিনায় নবীজি (সা.)-এর আগমনের আগেই একজন তরুণ সাহাবি কোরআনের বাণী হাতে নিয়ে মানুষের হৃদয়ে ইসলামের ভিত্তি গড়ে তুলছেন। তিনি কোনো রাজা ছিলেন না, কোনো সেনাপতিও ছিলেন না। ছিলেন মক্কার এক বিলাসী কুরাইশ যুবক—যিনি ঈমানের বিনিময়ে বিসর্জন দিয়েছিলেন তার সমস্ত দুনিয়াবি আরাম-আয়েশ।
মুসআব (রা.)-এর জীবনের এই অধ্যায় যেন ইসলামের ইতিহাসের এক বিস্ময়কর বাঁক।
একসময় মক্কার অভিজাত সমাজে যাঁর পোশাক, সৌন্দর্য ও জীবনযাপন ছিল আলোচনার বিষয়, ইসলাম গ্রহণের পর তিনিই হয়ে গেলেন আল্লাহর দ্বিনের এক নিবেদিতপ্রাণ দূত। পরিবার তাঁকে ত্যাগ করল, সম্পদ কেড়ে নেওয়া হলো, বিলাসী জীবন শেষ হয়ে গেল—কিন্তু তাঁর ঈমানের দীপ্তি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
আকাবার প্রথম শপথের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনার নতুন মুসলিমদের কোরআন শিক্ষা দেওয়া ও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য একজন যোগ্য মানুষের প্রয়োজন অনুভব করলেন, তখন তাঁর দৃষ্টি পড়ল এই তরুণ সাহাবির ওপর। নবীজি (সা.) মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে মদিনায় পাঠালেন। এ যেন ইসলামের ভবিষ্যৎ কেন্দ্রভূমি মদিনার মাটিতে একটি নতুন ইতিহাসের বীজ বপন করা।
মদিনায় গিয়ে মুসআব (রা.) ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠে কোরআনের আয়াত, আচরণে বিনয়, কথায় প্রজ্ঞা এবং হৃদয়ে ছিল মানুষের হেদায়াতের গভীর আকাঙ্ক্ষা। তাঁর দাওয়াতের প্রভাবে একে একে মদিনার প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ইসলামের ছায়াতলে আসতে থাকেন। সাদ ইবনে মুআয (রা.), উসাইদ ইবনে হুদাইর (রা.)-এর মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণ মদিনার সামাজিক চিত্রই বদলে দেয়।
মদিনায় মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে জুমার নামাজ আদায় শুরু করেন। তবে কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-এর নেতৃত্বে মদিনায় প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা পাওয়া যায়। এ কারণেই অনেক লেখায় তাকে মদিনার প্রথম জুমার ইমাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, কিছু প্রাচীন বর্ণনায় এসেছে, মদিনায় প্রথম জুমার নামাজ আসআদ ইবনে যুরারা (রা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন মদিনার প্রাথমিক মুসলিমদের অন্যতম এবং মুসআব (রা.)-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কিন্তু মতভেদ থাকলেও মুসআব (রা.) যে মদিনায় ইসলামের প্রাথমিক দাওয়াত ও মুসলিম সমাজ গঠনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
এই তরুণের গল্প শুধু প্রথম জুমার ইমামতির গল্প নয়। এটি একজন বিলাসী যুবকের ঈমানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করার গল্প, একজন তরুণ দাঈর একটি শহরের হৃদয় পরিবর্তন করার গল্প, আর শেষ পর্যন্ত উহুদের ময়দানে নিজের জীবন দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পতাকা রক্ষা করে শাহাদাতের অমর মর্যাদা অর্জনের গল্প।
মক্কার বিলাসী জীবন থেকে মদিনার দাঈ, নবীজির বিশ্বস্ত প্রতিনিধি থেকে জুমার নেতৃত্বদানকারী সাহাবি, আর সেখান থেকে উহুদের রক্তাক্ত ময়দানে শহিদ—মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-এর জীবন যেন ঈমান, দাওয়াত ও আত্মত্যাগের এক পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্য।