ঢাকা | বঙ্গাব্দ

‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে’: প্রসিকিউটরকে পলক; ট্রাইব্যুনাল বললেন, ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’

প্রসিকিউশনের উদ্দেশ্যে পলক বলেন, ‘এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন। এখানে আমার বিচার হচ্ছে। ধৈর্য নিয়ে কথা বলবেন। এখানে সবাই বিচারপ্রার্থী। আমরা আপনার কোনো আদেশ বা কথা শুনতে এখানে আসিনি।’
  • নিজস্ব প্রতিবেদক | ১১ অক্টোবর, ২০২৬
‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে’: প্রসিকিউটরকে পলক; ট্রাইব্যুনাল বললেন, ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’ ফাইল ছবি


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে প্রসিকিউশনের উদ্দেশ্যে 'ভয় পাইছে, ভয় পাইছে' বলে মন্তব্য করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। অনুমতি ছাড়া কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলা নিয়ে প্রসিকিউশনের সঙ্গে তার বাদানুবাদও হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল পলককে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'রেগে গেলেন তো, হেরে গেলেন।' পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন পলক।


সাক্ষ্যগ্রহণের এক পর্যায়ে প্রসিকিউশনের উদ্দেশ্যে ট্রাইব্যুনালে আসমীর কাঠগড়ায় থাকা পলক বলেন, 'ভয় পাইছে, ভয় পাইছে।' এছাড়াও বলেন, 'এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন। এখানে আমার বিচার হচ্ছে। ধৈর্য নিয়ে কথা বলবেন। এখানে সবাই বিচারপ্রার্থী। আমরা আপনার কোনো আদেশ বা কথা শুনতে এখানে আসিনি।'


রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই মামলায় দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তা মাহদী আমিন।


এই মামলায় দুই আসামির অন্যজন হলেন—ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।


জবানবন্দির একপর্যায়ে সাক্ষীর কাছে একটি প্রশ্ন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। অর্থাৎ তার কথাটি ভূতাপেক্ষ কিনা এটা জানতে চান। এ নিয়ে প্রথমে সাক্ষী বলতে না চাইলেও বলে ওঠেন ভূতাপেক্ষ হবে।


ঠিক তখনই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রসিকিউশনের উদ্দেশ্যে পলক বলেন, 'এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন। এখানে আমার বিচার হচ্ছে। ধৈর্য নিয়ে কথা বলবেন। এখানে সবাই বিচারপ্রার্থী। আমরা আপনার কোনো আদেশ বা কথা শুনতে এখানে আসিনি।'


এ সময় প্রসিকিউটর তামিম বলেন, 'এখানে আসামিপক্ষের আইনজীবী রয়েছেন। কিছু বলতে চাইলে তারা বলবেন। হুটহাট কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অনুমতি না নিয়ে কোনো আসামি এভাবে কথা বলতে পারেন না।' একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন দেখাতে চান এই প্রসিকিউটর। 


এ পর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলে ওঠেন, 'কথায় কথায় আইন দেখাচ্ছেন কেন।' এমন কথায় আপত্তি জানিয়ে ট্রাইব্যুনালের নজরে আনেন প্রসিকিউটর তামিম। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, 'আসামিপক্ষ কি এ কথা বলেছেন? এটা খুবই আপত্তিকর।' 


তখন আসামিপক্ষ থেকে বলা হয়, যদি প্রসিকিউশন কোনো কিছু নিয়ে কথা উত্থাপন করেন, তাহলে আসামি বা আইনজীবীও আপত্তি জানাতে পারেন। 


প্রসিকিউটর তামিম জানান, অনুমতি নিয়ে কথা বলতে হবে। এমন সময় প্রসিকিউটর মাঝেমধ্যে ক্ষেপে যান বলে মন্তব্য করে আসামিপক্ষ।


তামিম বলেন, 'আমি শুনছি, আপনারা কথায় কথায় আইন দেখান কেন, এটা বলেছেন। এরপর এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছি।'


এ সময় পলকের উদ্দেশ্যে ট্রাইব্যুনাল বলেন, 'রেগে গেলেন তো, হেরে গেলেন। তাই কথা বলতে চাইলে অনুমতি নিয়ে বলতে হবে। 


তখন পলক বলেন, 'অযৌক্তিক তো কিছু বলিনি।'


ট্রাইব্যুনাল বলেন, 'এখানে ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। কেউ কোনো কিছু ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না।'


এরপর আবারও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্যের একপর্যায়ে এনটিএমসির তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের প্রসঙ্গ টেনে আনেন সাক্ষী মাহদী আমিন। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসির কার্যালয়ে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে হওয়া এক বৈঠকে জিয়াউলকে থ্রি-জি ও ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়।


জবানবন্দির এ বাক্য নিয়ে আপত্তি জানান প্রসিকিউশন। অর্থাৎ কথাটি আলোচনা সাপেক্ষে এলেও এ মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত না বলে ব্যাখ্যা দেন তারা। একইসঙ্গে বাক্যটি বাদ দেওয়ার প্রার্থনা করেন। তখন সাক্ষীও প্রসিকিউশনের বক্তব্যে সায় দেন।


এ সময় সাক্ষীর উদ্দেশ্যে কাঠগড়ায় থাকা পলক বলে ওঠেন, 'ভয় পাইছে, ভয় পাইছে।' তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, 'একটু বসতে পারেন। কথা কম বলেন দয়া করে।'


অনুমতি নিয়ে পলক বলেন, 'মাননীয় আদালত, আমি বিনয়ের সঙ্গে অনুমতি চাই। প্রসিকিউটর মহোদয় সাক্ষীকে প্রশ্ন করে জবানবন্দি নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে এটা বাদ দিতে হলে হোস্টাইল করতে হবে।'


জবানবন্দিতে সাক্ষী উল্লেখ করেন, সারাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক এনটিএমসির নির্দেশনায় বন্ধ করা হয়। এ বক্তব্যটি আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। তবে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে আমি জানি না। চালু করার বিষয়ে ২৮ জুলাইয়ের সভার মাধ্যমে জানতে পেরেছি।


পলকের হয়ে ট্রাইব্যুনালে আইনি লড়াই করছেন আইনজীবী লিটন আহমেদ। আর পলাতক থাকায় জয়ের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পান আইনজীবী মনজুর আলম। তারা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। 


প্রসিকিউশনের আনা তিন অভিযোগে বলা হয়, জয়ের নির্দেশে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে ফেসবুকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ান পলক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এছাড়া ইন্টারনেট বন্ধ করে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি ও প্ররোচনা দেওয়া এবং হত্যায় সহায়তার অভিযোগও আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। 


এসব ঘটনায় রাসেল, মোসলেহ উদ্দিনসহ ২৮ জন নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরায় ৩৪ জনকে হত্যায় সহায়তার অভিযোগও রয়েছে।


চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জয়-পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া ফরমাল চার্জ আমলে নেন একই আদালত।




thebgbd.com/BYB